হাওজা নিউজ এজেন্সি: কিছুদিন ধরে আমি আত্মহত্যার কথা ভাবছি। এমনকি আত্মহত্যার চেষ্টা করার পর্যায়েও চলে গিয়েছিলাম। এর কারণও জানি না। এমন কোনো বিশেষ চাহিদা নেই, যা পূরণ না হওয়ার কারণে আমি আত্মহত্যা করতে চাই। আমি কী করব?
চলুন, আত্মহত্যার বিষয়টি কয়েকটি দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করি।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ
ইসলামের দৃষ্টিতে আত্মহত্যা হারাম। এটি ‘নফস হত্যা’ বা নিজেকে হত্যা করার শামিল, যা ইসলামে নিষিদ্ধ। মানুষ যে কোনো পরিস্থিতিতে নিজের জীবন শেষ করার অধিকার রাখে না। আত্মহত্যার কোনো শরিয়তসম্মত অনুমতি নেই। এটি কবিরা গুনাহগুলোর অন্তর্ভুক্ত এবং আত্মহত্যার মাধ্যমে মানুষ তওবার সুযোগ থেকেও নিজেকে বঞ্চিত করে।
প্রশ্ন: এই জীবন ও আত্মা তো আমাদের নিজেদের। আমরা আমাদের নিজেদের সম্পদ নষ্ট করতে চাইলে তা করতে পারব না কেন?
উত্তর: না! এটি আমাদের নিজেদের সম্পদ নয়। আমরা আল্লাহর বান্দা। আমাদের দেহ ও আত্মা আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। তিনিই আমাদের প্রকৃত মালিক। আমাদের কাছে দেহ ও আত্মা একটি মূল্যবান আমানত। তাই আমাদের দায়িত্ব হলো বিশ্বস্ততার সঙ্গে এই আমানত সংরক্ষণ করা এবং একদিন তা তার প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া।
হাফেজ কী সুন্দরভাবে বলেছেন, এই ধার করা প্রাণ, যা প্রিয়তম হাফেজের কাছে আমানত রেখেছেন, একদিন তাঁর দর্শন পাব এবং তা তাঁর কাছেই সমর্পণ করব।
নাসের খসরুও কত সুন্দর আধ্যাত্মিক উপলব্ধি থেকে বলেছেন, সৃষ্টিজগতের সবাই আল্লাহর রোপিত চারাগাছ; তাই এই চারাগাছগুলোর কোনোটি উপড়ে ফেলো না, কোনোটি ভেঙো না।
আমাদের নিজের শরীরের একটি আঙুলের অংশও ইচ্ছাকৃতভাবে কেটে ফেলার অধিকার নেই; কারণ এটিও আল্লাহর দেওয়া আমানত।
মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ
ইসলাম যেমন আত্মহত্যাকে নিষিদ্ধ করেছে, তেমনি মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও আত্মহত্যার চিন্তা একটি গুরুতর মানসিক সংকটের ইঙ্গিত হতে পারে।
আমাদের পরামর্শদানের অভিজ্ঞতায়, কেউ যখন আত্মহত্যার চিন্তার কথা জানান, তখন প্রথমেই তার মানসিক ও স্নায়বিক অবস্থার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়; এরপর তার ঈমান ও বিশ্বাসের অবস্থাও দেখা হয়। মানসিক ও স্নায়বিক অস্থিরতা মানুষকে বিভিন্ন ভুল পথে ঠেলে দিতে পারে, আত্মহত্যা যার একটি।
কোনো ব্যক্তিকে আত্মহত্যার কারণে ‘বোকা’ বা ‘অবিবেচক’ বলে আখ্যায়িত করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। তার মানসিক ও স্নায়বিক অবস্থা সম্পর্কে আমাদের যথেষ্ট জ্ঞান নাও থাকতে পারে। তবে কোনো ব্যক্তি যদি বিষণ্নতায় ভুগে থাকেন, তাহলে তার আত্মহত্যার প্রবণতার সঙ্গে সেই বিষণ্নতার সম্পর্ক থাকতে পারে। অবশ্যই বিষণ্নতা আত্মহত্যার কোনো অনুমতি নয়; কোনো কারণই আত্মহত্যার অনুমতি দেয় না।
যে ব্যক্তি আত্মহত্যার চিন্তা করেন বা আত্মহত্যার চেষ্টা করেন, তাকে ‘অপরাধী’ নয়, বরং একজন অসুস্থ মানুষ হিসেবে দেখা উচিত। তাকে দোষারোপ বা তিরস্কার নয়, বরং চিকিৎসা ও সহায়তা প্রয়োজন—স্নায়বিক, মানসিক এবং অবশ্যই প্রয়োজনীয় আধ্যাত্মিক সহায়তা।
যেহেতু আত্মহত্যার বিষয়টি ধর্মীয়, নৈতিক ও মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাপক আলোচনার দাবি রাখে এবং এই মুহূর্তে আপনার প্রয়োজন তাৎক্ষণিক করণীয় জানা, তাই বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক আলোচনা পরবর্তী সময়ের জন্য রেখে এখন কিছু জরুরি করণীয় তুলে ধরা হলো।
আত্মহত্যার চিন্তা এলে তাৎক্ষণিক করণীয়
১. এখনই একজন জ্ঞানী ও দক্ষ পরামর্শকের শরণাপন্ন হন। এমন একজন মনোবিজ্ঞানী বা কাউন্সেলরের কাছে যান, যিনি জ্ঞানী, দক্ষ ও অভিজ্ঞ। সম্ভব হলে এমন কাউকে খুঁজে নিন, যিনি মানসিক স্বাস্থ্য ও ধর্মীয় বিষয় সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান রাখেন। আপনার শহরে এমন কাউকে না পেলে যেখানে তিনি আছেন, সেখানে গিয়ে হলেও তার পরামর্শ নিন। সরাসরি পরামর্শ নেওয়া সম্ভব না হলে ফোনে বা অনলাইনেও পরামর্শ গ্রহণ করুন। এর ফলাফল আমাকে জানাবেন।
২. আপনার পরামর্শকের সঙ্গে সমন্বয় করে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যান। একজন দক্ষ মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। অবশ্যই। সমাজের কিছু মানুষের মধ্যে মনোরোগ চিকিৎসা নিয়ে যে ভুল ধারণা রয়েছে, তা যেন আপনার ওপর প্রভাব না ফেলে। আপনার মতো পরিস্থিতিতে থাকা ব্যক্তির জন্য একজন দক্ষ মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া অত্যন্ত জরুরি—শরিয়ত, বিজ্ঞান, যুক্তি, নৈতিকতা ও অভিজ্ঞতা—সব দিক থেকেই। এর ফলাফলও আমাকে জানাবেন।
৩. এখনই আল্লাহর সঙ্গে একান্তে কথা বলুন। আল্লাহর কাছে নিজের হৃদয়ের কথা খুলে বলুন। তাঁর কাছে সাহায্য চান। একান্তে থাকুন; কান্না এলে নির্দ্বিধায় কাঁদুন। সেই পরম দয়ালু ও বান্দার প্রতি স্নেহশীল প্রতিপালকের সঙ্গে নিজের গোপন কথাগুলো বলুন। কোনো আনুষ্ঠানিকতা বা বিশেষ ভাষার প্রয়োজন নেই। একেবারে আন্তরিক ও সহজভাবে আল্লাহর সঙ্গে কথা বলুন। এ কথা বলবেন না যে, ‘আল্লাহ তো আমার সব গোপন কথা এমনিতেই জানেন।’ হ্যাঁ, তিনি সবই জানেন। কিন্তু তবুও আপনি তাঁর কাছে নিজের কথা বলুন। তাঁর সঙ্গে একান্তে কথা বলুন, মুনাজাত করুন, নিজের কষ্ট ও যন্ত্রণা তাঁর কাছে তুলে ধরুন—স্বচ্ছন্দে, আন্তরিকভাবে এবং নিজের মতো করে।
হুজ্জাতুল ইসলাম আলী আকবর মোজাহেরি
আপনার কমেন্ট